ডেঙ্গু জ্বরের কারণ ও প্রতিকার


ডেঙ্গু জ্বরের কারণ ও প্রতিকার নিয়ে ভাবছেন। চিন্তার কারণ নেই। তবে ডেঙ্গু জ্বরকে শুধুমাত্র ভাইরাস জ্বর ভেবে উপেক্ষা করাও ঠিক হবে না। ডেঙ্গু ও জ্বর দুটো একে অপরের থেকে আলাদা হলেও ডেঙ্গু তুলনামূলকভাবে ভয়ংকর। এখন এই আর্টিকেলে আমরা ডেঙ্গু জ্বরের কারণ ও প্রতিকার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। 

ডেঙ্গু জ্বরের কারণ ও প্রতিকার

ডেঙ্গু ও জ্বর দুটি এক হওয়ার কারণে আপনি কি রোগে ভুগছেন, তা প্রথম অবস্থায় বোঝা কঠিন হতে পারে। তাই ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ বা উপসর্গ নিয়ে আলোচোনা করবো এতে করে আপনি ডেঙ্গু রোগ নির্ণয় করে ডেঙ্গু জ্বর হলে যা করণীয় কি তা ঠিক করে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করতে পারবেন। বিস্তারিত জানতে শেষ পর্যন্ত সাথেই থাকুন।

পোস্ট সূচিপত্রঃ ডেঙ্গু জ্বরের কারণ ও প্রতিকার

ভূমিকা

ডেঙ্গু ভাইরাস বহনকারী এডিস মশার কামড়ে তিন থেকে পনেরো দিনের মধ্যে  যে কারোরই ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ বা উপসর্গ দেখা দিতে পারে এ কারণে ডেঙ্গু জ্বরের উপসর্গ গুলো সবারই ভালোভাবে জানা উচিত।

ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ বা উপসর্গ

তিন থেকে পনেরো দিনের মধ্যে ভাইরাস বহনকারী এডিস মশার কামড়ে যে কারোরই ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ বা উপসর্গ দেখা দিতে পারে এ কারণে ডেঙ্গু জ্বরের উপসর্গ গুলো সবারই ভালোভাবে জানা উচিত। ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ বা উপসর্গ  লক্ষ করলে আমরা যা পাই তা হলোঃ
  • জ্বর ১০২ থেকে ১০৫ ডিগ্রী ফারেনহাইট পর্যন্ত হতে পারে
  • শরীর ও মাথা ব্যথা
  • বমি বমি ভাব বা  বমি হওয়া
  • চোখের পেছনে ব্যথা
  • চামড়ায় লালচে দাগ
  • শরীরে শীতলতা অনুভব করা
  • ক্ষুধা কমে যাওয়া
  • কোষ্ঠকাঠিন্য
  • স্বাদের পরিবর্তন
  • হৃদ স্পন্দনের হার ও রক্তচাপ কমে যাওয়া এবং
  • পেশীতে ও গাঁটে ব্যথা হওয়া

এডিস মশা কিভাবে ভাইরাস ছড়ায়

এডিস মশা যখন একজন সুস্থ মানুষকে কামড়ায় তখন সেই ব্যক্তি ডেঙ্গু ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয় এবং ঐ ব্যক্তি ডেঙ্গু ভাইরাসের একজন বাহক হয়ে যায়। এখন যদি ডেঙ্গু ভাইরাস বিহীন সাধারন কোন মশা ঐ আক্রান্ত ব্যক্তিকে কামড়ায় তাহলে সেই মশাটিও ডেঙ্গু ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়। এরপর এই মশা যতজনকে কামড় দেবে তারা প্রত্যেকে ডেঙ্গু ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হবে এবং এক একজন ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক হিসেবে কাজ করবে।

ডেঙ্গু রোগের ধরন

চিকিৎসকের মতেই মানুষের সাধারণত দুই ধরনের ডেঙ্গু জ্বর হয়। যেমনঃ ক্লাসিক্যাল জ্বর হেমোরেজিক জ্বর। ক্লাসিকাল জ্বর দুই থেকে সাত দিনের মধ্যে ভালো হয় আর বিপদ ঘটে হেমোরেজিক জ্বরের ক্ষেত্রে। এই জ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তির অবস্থা পাঁচ থেকে সাত দিন পর মারাত্মক সংকটাপন্ন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

ডেঙ্গু জ্বরের কারণ ও প্রতিকার

ডেঙ্গু জ্বরের কারণ ও প্রতিকার জানার আগে  প্রথমে আমাদের জানা প্রয়োজন আসলে এডিস কি? এডিস হলো একপ্রকার মশার প্রজাতি যা ডেঙ্গু ও পিজ্জ্বল এর মত মারাত্মক দুটি রোগের বাহক। এডিস মশা দেখতে অন্যান্য মশার মত নয়। এরা আলাদা ধরনের হয়। এদের দেহে ও পায়ে কালো এবং সাদা চিহ্ন রয়েছে। এরা দিনের বেলায় কামড় দেয়। ডেঙ্গু জ্বরের কারণ ও প্রতিকার জানতে হলে প্রথমে জানতে হবে ডেঙ্গু কি? ডেঙ্গু এডিস মশা বাহিত ভাইরাস জনিত এক ধরনের তীব্র জ্বর। সাম্প্রতিককালে সবচেয়ে ভয়ংকর আতঙ্ক হিসেবে দেখা দিয়েছে ডেঙ্গু জ্বর।

অনেক দেশেই ডেঙ্গু জ্বরের আতঙ্ক রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী ১৯৯৬ সালে গোটা বিশ্বে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিল প্রায় দুই কোটি মানুষ। হালকা ডেঙ্গু জ্বরের কারণে প্রচন্ড জ্বরের মতো উপসর্গ দেখা দেয় সাধারণত যারা একবার ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে তাদের পরবর্তীতে এ রোগ দেখা দিলে প্রাণঘাতী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ডেঙ্গু প্রতিকার করতে চিকিৎখরা বেশি বেশি তরল খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। যেমন ভাতের মাড়, স্যালাইন ডাবের পানি সো ফলের রস লেবুর প্রাণী ইত্যাদি। এসব তরল খাবার ৯০% ডেঙ্গুর তীব্রতা কমায়। 

আবার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার যেমন ডাল, ডিম, মুরগির মাংস, ছোট মাছের ঝোল বেশি করে রাখতে হবে খাদ্য তালিকায়। ডেঙ্গু হলে শরীরে প্লাটিলেট কমে যায়, তাই প্লাটিলেট বাড়ে এমন খাব খেতে হবে।প্লাটিলেট যুক্ত খাবার যেমন-পালং শাক, আদা, রসুন, হলুদ, কাঠবাদাম, দই, গ্রিন টি, ডালিম, নিম পাতার রস, পেঁপে পাতার রস, সূর্যমুখী বীজ, ব্রকলি ও ক্যাপসিকাম।


ডেঙ্গু জ্বরের কারণে শরীরে পানি শূন্যতা দেখা দেয় তাই শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে ডাবের পানি, পেয়ারার শরবত ডেঙ্গু প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে তাই ভিটামিন সমৃদ্ধ এই পানীয়টি পান করতে পারেন। ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধে হলুদ খুব উপকারী খাদ্য। এক গ্লাস দুধের সাথে এক চিমটি হলুদ মিশেয়ে নিয়মিত পান করলে দ্রুত সুস্থ হতে সাহায্য করে। আবার মেথি ব্যথা কমাতে ও সহজে ঘুমাতে সাহায্য করে, এটি অতিমাত্রায় জ্বর কমিয়ে আনে যা ডেঙ্গুর একটি সাধারণ লক্ষণ। তবে মেথি খাওয়ার আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।


এছাড়া বিভিন্ন ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল ডেঙ্গু জ্বরে অত্যন্ত উপকারী। ডেঙ্গু জ্বর হলে তৈলাক্ত বেশি মসলাযুক্ত খাবার না খাওয়া উচিত। অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবার উচ্চ রক্তচাপ ও উচ্চ কোলেস্টরেলের কারণ হতে পারে। এই সময় শরীরে প্রচুর তরল প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় এড়িয়ে রিলাক্সিং ফ্লুইড খাবার খাওয়া উত্তম।

ডেঙ্গু মশা কামড়ানোর কত সময় পর জ্বর হয়

একটি এডিস মশা বা ডেঙ্গু ভাইরাস বহনকারী মশা কামড়ের চার থেকে দশ দিনের মধ্যে সচরাচর ডেঙ্গু জ্বরের উপসর্গ বা লক্ষনগুলো দেখা দেয়।

ডেঙ্গু জ্বর কত দিন থাকে

ডেঙ্গু জ্বর সাধারণত তিন থেকে ছয় দিন পর্যন্ত থাকতে পারে। জ্বর ভালো হয়ে যাওয়ার ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা সময়কে বলা হয় সংকটকাল।

ডেঙ্গু জ্বর কি ছোঁয়াচে রোগ

ডেঙ্গু জ্বর কি ছোঁয়াচে রোগ? এ প্রশ্নের উত্তর এক কথায় বলতে পারি ডেঙ্গু জ্বর ছোঁয়াচে রোগ নয় বা এক ব্যক্তি থেকে আরেক ব্যক্তিতে সংক্রমিত হয় না তবে আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য মশারি ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ কেননা সে ডেঙ্গু বাহক। আক্রান্ত ব্যক্তিকে যে কোন মশা কামড়ালে সেই মশাও ডেঙ্গু ভাইরাস বহন করে এবং সেই মশার সাহায্যে ডেঙ্গু বিস্তার লাভ করে।

ডেঙ্গু জ্বর হলে কি খেতে হবে

ডেঙ্গু জ্বর হলে শরীরের হিমোগ্লোবিন ও প্ল্যাটিলেটের সংখ্যা কমে যায়। হিমোগ্লোবিন ও প্ল্যাটিন তৈরি করতে শরীরে প্রচুর পরিমাণে আয়রনের প্রয়োজন তাই খেজুর, কিসমিস, জলপাই, সবুজ শাকসবজি,কলিজা, ডিম, ডালিম, মিষ্টি কুমড়ার বিচি, বিট জুস, কমলা, ডালিম, ডাবের পানি, হলুদ, ব্রকলি, পালং শাক, মেথি, পেপে পাতার জুস, নিম পাতার জুস, আদা, রসুন, কাঠবাদাম, দই, গ্রিন টি, সূর্যমুখী বীজ, ও ক্যাপসিকাম। ডেঙ্গু জ্বরের কারণে শরীরে পানি শূন্যতা দেখা দেয় তাই শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে পেয়ারার শরবত, ডাবের পানি পান করতে পারেন।

ডেঙ্গু জ্বর হলে করণীয় বা করবেন

  • ডেঙ্গু হলে বিশ্রাম নিতে হবে।
  • ডাবের পানি, লেবুর রস, ফলের রস, লবন পানি করতে পারেন।
  • ডেঙ্গু জ্বর হলে প্যারাসিটামল বা নাপা খেতে পারেন।
  • সবসময় মশারি টাঙ্গিয়ে থাকতে হবে।
  • বেশি অসুস্থ হলে ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে।

ডেঙ্গু জ্বর হলে যা করবেন না

  • শরীর ব্যথার জন্য ব্যথা নাশক ঔষধ গ্রহণ করা উচিত নয়।
  • ধূমপান করবেন না কারণ এটি রক্তের উপাদানের তারতম্য করা সহ নানাবিধ ক্ষতি সাধন করে।
  • প্লাটিলেট হিসাব নিয়ে চিন্তা করার প্রয়োজন নেই জ্বর কমে গেলে নিজে থেকে প্লাটিলেট বাড়তে শুরু করে।
  • এ সময় তৈলাক্ত খাবার ও ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় পান করবেন।
  • প্লাটিলেট বেশি কমে গেলে ঘরে বসে না থেকে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন।

ডেঙ্গু প্রতিরোধ

  • রান্নাঘর, টয়লেট,বারান্দায় পানির টবে, পাতিলে বা কলসিতে ৪-৫ দিনের বেশি পানি জমে না রাখা।
  • বৃষ্টির পরে চারপাশে কোন পাত্রে বা পরিত্যাক্ত জায়গায় পানি জমতে না দেওয়া।
  • ফ্রিজ কিংবা এসির পানি দীর্ঘদিন জমতে না দেওয়া ।
  • মশা তাড়ানো ঔষধ ব্যবহার করা।
  • দিনের বেলা, সন্ধ্যার সময় ও সন্ধ্যার আগে ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করা।

উপসংহার

শুধু সরকার এককভাবে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও প্রতিকার করতে পারবে না তাই আসুন ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও প্রতিকারে সরকারের পাশাপাশি আমরাও আতঙ্ক না হয়ে সতর্ক ও সচেতন হই। আসুন সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টায় ডেঙ্গু বিস্তাররোধ করি।


P class="alart info" 
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url